রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শুক্রবার কক্সবাজারের উখিয়ায় শরণার্থী শিবিরে এক ঐতিহাসিক ইফতার আয়োজনের মাধ্যমে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করে তারা রোহিঙ্গাদের হৃদয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছেন। এটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইফতার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা ও জাতিসংঘ মহাসচিবের একসঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগমনের খবরে শরণার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি হয়। রোহিঙ্গা নেতারা মনে করছেন, এই সফর তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ইস্যুতে নতুন গতি আনতে পারে। জাতিসংঘ মহাসচিব এর আগে একবার ক্যাম্প পরিদর্শন করলেও, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের এটি প্রথম সফর।
বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির হিসেবে পরিচিত উখিয়া-টেকনাফ ক্যাম্পে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আট বছর ধরে অনিশ্চিত জীবনের মাঝে দিন কাটাচ্ছেন। এ সময়ে একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরতে পারেননি; বরং সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে আরও ৬০-৭০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে।
এরই মাঝে বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসেন জাতিসংঘ মহাসচিব। শুক্রবার দুপুরে তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা হ্রাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বিশ্ব এখন প্রতিরক্ষা ব্যয়ে মনোযোগী, কিন্তু মানবিক সহায়তা সংকুচিত হচ্ছে, যা অন্যায়।”
পরে জাতিসংঘ মহাসচিব কক্সবাজার গিয়ে ড. ইউনূসের সঙ্গে রোহিঙ্গা লার্নিং সেন্টার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাটজাত পণ্য উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সন্ধ্যায় এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতারে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, “আমি তাদের সাহস ও সংকল্প দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পথ খুলতে হবে।”
রোহিঙ্গারা এ সফরকে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের দাবি, নিরাপদ জোন তৈরি করে দ্রুত তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে হবে।
এদিকে, জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা হস্তশিল্প পরিদর্শন করে প্রশংসা করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান।
এই সফরের মধ্যে দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, “এই ঈদে না হোক, আগামী রোজার ঈদ যেন রোহিঙ্গারা তাদের মাতৃভূমিতে উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাব।”
তবে এই ঐতিহাসিক সফর কিছুটা শোকের ছায়াও ফেলেছে। ইফতার মাহফিলে অংশ নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে এক রোহিঙ্গা নিহত ও দুইজন আহত হন। ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
রোহিঙ্গারা তাদের দাবি তুলে ধরে বলেছেন, “আমাদের দেশে ফেরার দায়িত্ব জাতিসংঘের। আমরা আর ভিনদেশে আশ্রিত থাকতে চাই না।” জাতিসংঘ মহাসচিব তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তার এ সফর রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে নতুন আলো ফেলবে বলেই ধারণা সংশ্লিষ্টদের।